টানা সপ্তম মাস ঊর্ধ্বমুখিতায় শেষ করল এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারের অধিকাংশ সূচক। গতকালও অক্টোবরের শেষ দিনে এশিয়ার বৃহৎ পুঁজিবাজারগুলোর অধিকাংশেরই বেশির ভাগ সূচক বেড়েছে। অ্যামাজন ও অ্যাপলের মতো বড় কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশামাফিক আয় করেছে বলে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে গতকাল ওয়াল স্ট্রিটের ফিউচার সূচকগুলোয়ও দেখা গেছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। আবার দেশটিতে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) পরবর্তী বৈঠকে সুদহার কমানোর বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ডলারের বিনিময় হার এখন তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি পর্যায়ে স্থিতিশীল রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলেও গতকাল ইউরোপীয় বাজারে দিনের শুরুতে ফিউচার সূচকগুলোয় কিছুটা নিম্নমুখিতা দেখা যায়। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গতকাল বিকালে এ প্রতিবেদন লেখার সময় ইউরো স্টক্স ৫০ ফিউচার সূচক দশমিক ২ ও যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ফিউচার দশমিক ৩ সংকুচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নাসডাক ফিউচার ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক বেড়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ১ ও দশমিক ৬ শতাংশ। অ্যামাজনের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আয় বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশের পর পোস্ট মার্কেট লেনদেনে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এতে টেক জায়ান্টটির বাজারমূল্য বেড়েছে ৩০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। অন্যদিকে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে আইফোনের বিক্রি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে বলে অ্যাপলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ খবর প্রকাশের পর অ্যাপলের শেয়ারদর বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
এর আগে মেটা ও মাইক্রোসফটের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অ্যামাজন ও অ্যাপলের আর্থিক প্রতিবেদনে সৃষ্ট বাজার উত্থান সে প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে মেটা ও মাইক্রোসফটের ব্যয় বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে, বাজারে যার স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে।
মার্কিন শেয়ারবাজারে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে পরিচিত সাতটি প্রযুক্তি জায়ান্টের মধ্যে ছয়টি এরই মধ্যে সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া প্রান্তিকের আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর এনভিডিয়ার প্রতিবেদন প্রকাশ হবে সপ্তাহ তিনেক পর। এরই মধ্যে বিশ্বের প্রথম ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হিসেবে রেকর্ড গড়েছে এনভিডিয়া।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান এএমপির উপপ্রধান অর্থনীতি ডায়ানা মুসিনা বলেন, ‘প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মুনাফা প্রবৃদ্ধি এখনো আশ্চর্যজনকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। তবে তা কিছুটা শ্লথ হবে। তাই উচ্চ মূল্যায়নের কারণে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোর শেয়ারদরে সামান্য সংশোধন দেখা যেতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক কিছু ওঠানামা সত্ত্বেও ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন হিসেবে পরিচিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের রিটার্ন চলতি বছরের শুরু থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে ছাড়িয়ে গেছে।’
গতকাল জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে সর্বশেষ এক সপ্তাহে সূচকটি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৬ শতাংশে। সদ্যসমাপ্ত অক্টোবরে নিক্কেই সূচক বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এক মাসে বৃদ্ধির হার হিসেবে এটি ছিল ১৯৯০ সালের পর সর্বোচ্চ। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে বৃহৎ আর্থিক প্রণোদনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় জাপানের শেয়ারবাজার এখন ঊর্ধ্বমুখিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে জাপানকে বাদ দিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারগুলোর এমএসসিআই সূচক শুক্রবার দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। সূচকটিতে গতকালের এ সংকোচনের প্রধান প্রভাবক ছিল চীনা শেয়ারবাজারের পতন। তা সত্ত্বেও সূচকটি সপ্তাহজুড়ে ১ শতাংশ ও অক্টোবরে ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে।
গতকাল চীনের মূল ভূখণ্ডের ব্লু-চিপ সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশটিতে কারখানা কার্যক্রম বিগত ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে। এ পরিসংখ্যানেরই প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারে।
এতদিন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে চলেছে চীন-মার্কিন বাণিজ্যবিবাদ। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার সাম্প্রতিক বৈঠকের পর সে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমন হয়েছে। এরপর কিছু বিনিয়োগকারী বাজার থেকে মুনাফার একটি অংশ তুলে নিয়েছেন। যদিও গত সপ্তাহের শুরুর দিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে প্রায় ১ শতাংশ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর নাসডাক সূচকে ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি পতন দেখা যায়।
গত সপ্তাহে বিশ্বের প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকগুলো মোটামুটি বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সবচেয়ে বড় চমক ছিল মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের মন্তব্য। ডিসেম্বরে ফেড আরেক দফা সুদহার নাও কমাতে পারে বলে তার করা মন্তব্য বাজারে সংশয় তৈরি করেছে।
মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড গতকাল স্থিতিশীল ছিল। তবে গত সপ্তাহের পুরো সময় এ ইল্ডে কিছুটা পতন দেখা যায়। গতকাল ২ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১২ বেসিস পয়েন্ট বেশি। ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশের কাছাকাছি। সপ্তাহজুড়ে এ ইল্ড বেড়েছে ১০ বেসিস পয়েন্ট।
বন্ডের ইল্ডে এ উত্থান মার্কিন ডলারের বিনিময় হারকে স্থিতিশীল পর্যায়ে ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। প্রধান মুদ্রাগুলোর বাস্কেট নিয়ে গঠিত মুদ্রাবাজার সূচকে ডলারের মান এখন তিন মাসের সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৫ পয়েন্টে স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি ইউরোর বিনিময় হার স্থির রয়েছে প্রায় ১ ডলার ১৬ সেন্টের কাছাকাছিতে। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে সুদহার ২ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে ইউরোজোনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি জানিয়েছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি কিছুটা কমতির দিকে থাকায় এ অঞ্চলের মুদ্রানীতি এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে।